বলা হয়ে থাকে, আমেরিকা ও ইসরায়েল সারা পৃথিবীর চেয়ে অন্তত ২০ বছর এগিয়ে চিন্তা করে। ভবিষ্যতের যুদ্ধ যে ড্রোনের দখলে চলে যাবে, তা তারা বহু আগেই আঁচ করতে পেরেছিল। আর তাই তো তারা তৈরি করেছিল ভয়ংকর সব সার্ভিল্যান্স ও কমব্যাট ড্রোন।
কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! আজ নিজেদের তৈরি সেই উন্নত প্রযুক্তিই তাদের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৫ ডিসেম্বর, ২০১১ আফগানিস্তানের মাটি থেকে ডানা মেলেছিল আমেরিকার অতিগোপন ও অত্যাধুনিক স্টেলথ ড্রোন – লকহিড মার্টিন RQ-170 সেন্টিনেল। উদ্দেশ্য: ইরানের আকাশসীমায় ঢুকে তাদের নিউক্লিয়ার প্রজেক্টের ওপর নজরদারি করা।
কিন্তু আমেরিকার সব অহংকার ধুলোয় মিশিয়ে দিল ইরানের ‘ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ইউনিট’। আকাশে থাকা অবস্থাতেই ড্রোনের কমিউনিকেশন সিগন্যাল জ্যাম করে সেটিকে অটোপাইলট মোডে নিতে বাধ্য করে ইরান। এরপর চলে নিখুঁত ‘GPS স্পুফিং অ্যাটাক’। ড্রোনটিকে ভুল লোকেশন বা কো-অর্ডিনেটস দিয়ে, কোনো রকম ক্ষতি ছাড়াই ইরানের মাটিতে নামিয়ে আনা হয়! আমেরিকার রাডারকে ফাঁকি দিয়ে ড্রোনটি ততক্ষণে ইরানের আকাশসীমায় ২২৫ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে পড়েছিল।
শুরুতে আমেরিকা পুরো বিষয়টিই চেপে যেতে চায়। তারা সরাসরি অস্বীকার করে বসে, “এটি আমাদের ড্রোন নয়!” কিন্তু ইরান যখন আস্ত ড্রোনটি তাদের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিল, তখন আমেরিকার আর মুখ লুকানোর জায়গা রইল না।
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অবশেষে স্বীকার করতে বাধ্য হন। তবে তিনি দাবি করেন, ‘টেকনিক্যাল ত্রুটির’ কারণে ড্রোনটি ক্র্যাশ করেছে। এরপর তিনি ইরানের কাছে ড্রোনটি ফেরত দেওয়ারও অনুরোধ জানান। কিন্তু ইরান কি আর সেই সোনার ডিম পাড়া হাঁস হাতছাড়া করে? তারা সরাসরি নাকচ করে দেয় আমেরিকার সেই আবদার।
এরপরই শুরু হয় আসল খেলা। ওই অত্যাধুনিক আমেরিকান ড্রোনটিকে রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং করে ইরান জন্ম দেয় নিজেদের তিনটি বিধ্বংসী ড্রোনের:
- শাহেদ ১৭১: এটি ছিল হুবহু আমেরিকান RQ-170-এর কপি।
- শাহেদ ১৯১: এখানে ইরান নিজস্ব প্রযুক্তি যোগ করে ড্রোনটিকে আপগ্রেড করে এবং সরাসরি যুদ্ধ বা ‘কমব্যাট ক্যাপাবল’ করে তোলে।
- শাহেদ ১৩৬ (দ্য গেম চেঞ্জার): এটিই সেই ড্রোন, যা আজ বিশ্বের মানচিত্র কাঁপিয়ে দিচ্ছে! ২০০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে, ৪০-৫০ কেজি বিস্ফোরক নিয়ে এটি নিখুঁতভাবে আত্মঘাতী হামলা চালাতে সক্ষম। জিপিএস এবং অ্যান্টি-জ্যামিং প্রযুক্তিতে ভরপুর এই ‘কামিকাজি ড্রোন’ আজ বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি অস্ত্র।
গল্পের সবচেয়ে মজার এবং অবাক করা দিকটি জানেন? যে আমেরিকার ড্রোন কপি করে ইরান ‘শাহেদ’ বানাল, সেই আমেরিকাই এখন ইরানের ‘শাহেদ ১৩৬’-কে রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং করে ‘লোকাস’ (Locust) নামে একটি কমদামি ড্রোন তৈরি করেছে!
কিন্তু ওই যে কথায় আছে – “শাহেদ তো শাহেদ-ই!”



