প্রাচীন সিল্ক রোড থেকে আধুনিক ব্রিকস: ইতিহাস ও ভূ-রাজনীতিতে চীন-ইরান সম্পর্কের হাজার বছরের শেকড়

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে যখন আমরা দেখি ইরান এবং চীন ২৫ বছর মেয়াদী এক বিশাল কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করছে কিংবা ব্রিকস -এর মতো জোটে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে, তখন অনেকেই একে নিছক ‘স্বার্থের সম্পর্ক’ বা পশ্চিমাদের চাপে পড়ে তৈরি হওয়া ‘অস্থায়ী জোট’ বলে মনে করেন।

কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে। ড্রাগন (চীন) এবং সিংহের (প্রাচীন পারস্য বা ইরান) এই মৈত্রী কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এর শেকড় প্রোথিত আছে আড়াই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে। ‘লুক ইস্ট’ বা পুবের দিকে নজর দেওয়ার যে নীতি ইরান আজ গ্রহণ করেছে, তা মূলত তাদের সেই প্রাচীন স্বর্ণযুগেরই এক আধুনিক পুনরাবৃত্তি।

চলুন, দিগন্তকণ্ঠের আজকের এই বিশেষ আয়োজনে চীন ও ইরানের সম্পর্কের সেই ঐতিহাসিক এবং রোমাঞ্চকর পথপরিক্রমা বিস্তারিতভাবে জেনে নিই:

সিল্ক রোডের সূচনা: দুই পরাশক্তির প্রথম করমর্দন

চীন ও ইরানের সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে, বিখ্যাত ‘সিল্ক রোড’ বা রেশম পথের মাধ্যমে। চীনের হান রাজবংশের সম্রাট উ যখন পশ্চিমে বাণিজ্যের বিস্তার ঘটাতে চাইলেন, তখন তিনি তার বিখ্যাত দূত ঝাং কিয়ান -কে পাঠান।

চীনা ঐতিহাসিক সিমা চিয়ানের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রেকর্ডস অব দ্য গ্র্যান্ড হিস্টোরিয়ান’ থেকে জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ১১৯ সালের দিকে চীনা দূত যখন প্রাচীন পারস্যের পার্থিয়ান সাম্রাজ্যের সীমান্তে পৌঁছান, তখন পারস্য সম্রাট দ্বিতীয় মিথ্রিডেটস তাকে রাজকীয় সম্মান জানান। চীনা দূতকে স্বাগত জানাতে তিনি ২০ হাজার সুসজ্জিত অশ্বারোহী সৈন্য পাঠিয়েছিলেন! সেই থেকে শুরু। চীন থেকে রেশম, কাগজ ও সিরামিক আসতে শুরু করে পারস্যে; আর পারস্য থেকে চীনের সম্রাটদের দরবারে যেতে থাকে উন্নত জাতের ঘোড়া, আঙুর, ডালিম, শণ এবং রুপার কারুকাজ করা তৈজসপত্র।

বিপদের দিনে পরম বন্ধু: সাসানিদ রাজপুত্রদের চীনে আশ্রয়

ইতিহাসের সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং আবেগময় ঘটনাটি ঘটে ৭ম শতাব্দীতে। আরব মুসলমানদের আক্রমণে পারস্যের পরাক্রমশালী সাসানিদ সাম্রাজ্যের যখন পতন ঘটে, তখন পারস্যের শেষ রাজপুত্র পেরোজ এবং তার হাজারো অনুসারী প্রাণ বাঁচাতে সুদূর চীনে পালিয়ে যান।

চীনের তৎকালীন শক্তিশালী তাং রাজবংশের সম্রাট গাওজং কেবল তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়ই দেননি, বরং রাজপুত্র পেরোজকে চীনা সেনাবাহিনীর জেনারেল পদ দিয়ে সম্মান জানিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, পারস্যের এই শরণার্থীদের জন্য চীনের রাজধানী চাংআনে (বর্তমান শিয়ান) জরাথুস্ত্র ধর্মের একাধিক অগ্নি উপাসনালয় তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল। একটি জাতির চরম বিপদের দিনে চীনের এই উদার আতিথেয়তা পারস্যের মানুষ কখনোই ভোলেনি।

মঙ্গোল যুগে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধন

ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে চেঙ্গিস খানের বংশধররা যখন এশিয়া জয় করে, তখন চীন (ইউয়ান রাজবংশ) এবং পারস্য (ইলখানাত) একই বিশাল মঙ্গোল সাম্রাজ্যের দুই প্রদেশ বা অংশে পরিণত হয়। এই সময় দুই অঞ্চলের মধ্যে ভৌগোলিক কোনো বাধা না থাকায় জ্ঞান, বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও সংস্কৃতির অভূতপূর্ব আদান-প্রদান ঘটে।

  • জ্যোতির্বিজ্ঞান ও প্রকৌশল: পারস্যের বিখ্যাত মুসলিম জ্যোতির্বিদ জামাল আদ-দিন চীনে গিয়ে মানমন্দির গড়েন এবং চীনা ক্যালেন্ডার সংস্কারে সাহায্য করেন।
  • চিকিৎসা বিজ্ঞান: ইবনে সিনার চিকিৎসাবিদ্যা এবং পারস্যের বিভিন্ন ওষুধের ব্যবহার চীনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
  • শিল্পকলা: চীনের বিখ্যাত ‘ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট পোরসেলিন’ (নীল-সাদা চিনা-মাটির পাত্র) বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পাত্রের যে উজ্জ্বল নীল রঙ, তা তৈরি হতো পারস্য থেকে আমদানি করা ‘কোবাল্ট ব্লু’ বা খনিজ নীল রঙ দিয়ে! পারস্যে একে বলা হতো ‘সুলেমানি রঙ’।

মিং রাজবংশ এবং অ্যাডমিরাল চেং হো-এর নৌযাত্রা

পঞ্চদশ শতাব্দীতে চীনের বিখ্যাত মুসলিম নৌ-সেনাপতি অ্যাডমিরাল চেং হো তার সুবিশাল ‘ট্রেজার ফ্লিট’ বা গুপ্তধনের নৌবহর নিয়ে বিশ্বভ্রমণে বের হন। তার এই নৌবহর পারস্য উপসাগরের কৌশলগত বন্দর হরমুজে অন্তত তিনবার নোঙর করেছিল।

চেং হো চীন থেকে নিয়ে এসেছিলেন সিল্ক এবং সিরামিক, আর হরমুজ থেকে চীনের সম্রাটের জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন পারস্যের সিংহ, উটপাখি এবং মহামূল্যবান রত্নরাজি। তার এই সফর দুই দেশের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।

সংস্কৃতির নীরব আদান-প্রদান

সাংস্কৃতিক বিনিময়ের দিক থেকেও এই দুই দেশ একে অপরের দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত। প্রাচীন চীনের শহরগুলোতে হাজার হাজার পার্সিয়ান বণিক স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন, যাদের অনেকেই পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেন। পারস্যের ঐতিহ্যবাহী পোলো খেলা, কার্পেট বোনার কৌশল এবং বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র চীনা সংস্কৃতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। আজও ফারসি এবং চীনা ভাষার অনেক প্রাচীন শব্দে একে অপরের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

বর্তমান যুগে আমেরিকা যখন ইরানকে কোণঠাসা করার জন্য একের পর এক অর্থনৈতিক অবরোধ দিচ্ছে, তখন চীনের সাথে ইরানের এই বিলিয়ন ডলারের চুক্তি বা স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ আসলে কোনো নতুন ঘটনা নয়। এটি হলো আড়াই হাজার বছরের পুরোনো সিল্ক রোডের সেই ঐতিহাসিক মৈত্রীরই এক আধুনিক সংস্করণ।

ইতিহাস সাক্ষী, যখনই এশিয়াতে কোনো শক্তিশালী বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক বলয় তৈরি হয়েছে, চীন ও ইরান সবসময় একে অপরের বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে। আধুনিক বিশ্ব রাজনীতিতেও এই দুই প্রাচীন সভ্যতার মেলবন্ধন প্রমাণ করে, তাদের বন্ধুত্বের শেকড় কতটা গভীরে প্রোথিত।