গণভোটের রায় বাস্তবায়ন: এক চুলও বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ নেই

সদ্য সমাপ্ত গণভোটে দেশের আপামর জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত ‘হ্যাঁ’ সূচক রায় কেবল একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর জয় নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের এক চূড়ান্ত ও অলঙ্ঘনীয় জনআদেশ। ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর মাধ্যমে যে আইনি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে, তা এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনি দলিল। এই রায়ের পর সংবিধান সংস্কার বা সংসদ গঠনের কোনো ধাপ নিয়ে কালক্ষেপণ বা জনআদেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ এখন আইনিভাবেই রুদ্ধ।

বাস্তবায়ন আদেশের ৮(১)(ক) ধারা অনুযায়ী, আসন্ন নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিরা কেবল সাধারণ আইনপ্রণেতা নন, তারা একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে ‘গঠনতান্ত্রিক ক্ষমতা’ (Constituent Power) প্রয়োগ করবেন। এর অর্থ হলো, তারা একটি নতুন ও শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার আইনি ও নৈতিক ম্যান্ডেট পেয়েছেন। আদেশের ৯(১) ধারা অনুযায়ী তাদের এই দ্বৈত দায়িত্ব পালনের জন্য শপথও নিতে হবে পৃথকভাবে। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের পরপরই সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে পুনরায় শপথ গ্রহণ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি জনগণের অর্পিত পবিত্র আমানত রক্ষার এক আইনি অঙ্গীকার।

আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে অতীতে অনেক সংস্কার উদ্যোগ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা রাজনৈতিক মতভেদে আটকে গেছে। কিন্তু এবারের ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ সেই পথ বন্ধ করে দিয়েছে। আদেশের ৮(১)(গ) ও ৮(১)(ঙ) ধারা অনুযায়ী, ২৭০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে সংস্কার কাজ শেষ করতে হবে এবং কোনো কারণে ব্যর্থ হলে বিলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যাবে। এটি নিশ্চিত করে যে, জনগণের রায়কে কোনো প্রভাবশালী মহলের অপচেষ্টা বা সংসদীয় অচলাবস্থার মাধ্যমে স্তিমিত করা যাবে না।

বিশেষ করে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ গঠনে ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ বা পিআর (PR) পদ্ধতির অনিবার্যতা নিয়ে যে বিতর্কের চেষ্টা কেউ কেউ করছেন, তা এখন অর্থহীন। যেহেতু গণভোটে জনগণ ৩০টি সংস্কার প্রস্তাবের সাথে এই পদ্ধতিতে সায় দিয়েছে, তাই এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার বা সংসদের নমনীয় হওয়ার কোনো আইনি অবকাশ নেই। একইভাবে ডেপুটি স্পিকার পদটি বিরোধী দলের জন্য বরাদ্দ রাখা কিংবা প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা নিশ্চিত করা—এগুলো এখন জনরায়ে স্বীকৃত বাধ্যতামূলক সংস্কার।

পরিশেষে আমরা বলতে চাই, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের অংশটুকু সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছে। এখন দায়িত্ব নির্বাচিত প্রতিনিধিদের। ২৭০ দিনের যে সাংবিধানিক সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, তার প্রতি প্রতিটি সেকেন্ডের জবাবদিহি জনগণের কাছে নিশ্চিত করতে হবে। ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন কেবল একটি আদেশ নয়, এটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর। এখান থেকে এক চুল বিচ্যুত হওয়া মানেই হবে গণরায়ের অবমাননা।