তিনটি নির্বাচনের স্মৃতি এবং “ম্যানেজড’ নির্বাচনের ভীতি (শেষ পর্ব)
সাব্বির মুহাম্মাদ নাঈম, ব্যাংকার এবং রাজনীতির পাঠক
‘ম্যানেজড’ নির্বাচনের একটি ক্লাসিক উদাহরণ হলো ২০০৮ সালের নির্বাচন। এই নির্বাচনই শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার পাটাতন তৈরী করে দিয়েছিল। ০৭ জানুয়ারী ২০২৬ ঢাকা রিপোরটার্স ইউনিটিতে বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত এক শোকসভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ২০০৮ সালে যে নির্বাচন হয়েছিল সেটা মেটিকুলাস বিভিন্ন শক্তি নিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল। তা না হলে বিএনপি এত জনপ্রিয় দল ৩০ থেকে ৩৫ টি আসন কেন পাবে? (সূত্র: আমার দেশ, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬)। এরপর ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, সংসদ নির্বাচন (২০১৪,২০১৮ ও ২০২৪) তদন্ত কমিশন প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের প্রতিবেদন পেশ করে। ঐ প্রতিবেদনে তদন্ত কমিশনের সদস্যরা ২০০৮ সালের নির্বাচনকে সন্দেহজনক উল্লেখ করে ওই নির্বাচন নিয়েও তদন্ত করার সুপারিশ করেছেন। আসলে ২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়ে ড. মঈন খান এবং সংসদ নির্বাচন তদন্ত কমিশন নতুন কিছু বলেননি। ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের নি:সঙ্গ শেরপা আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান নির্বাচনের পরপরই ০৪.০১.২০০৯ হতে ২৮.০১.২০০৯ পর্যন্ত দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত পাঁচটি কলামে বস্তুনিষ্ট তথ্য-উপাত্ত ও বিশ্লেষণসহ ২০০৮ সালের নির্বাচনের কারচুপির বিষয়গুলো তুলে ধরেছিলেন। সে সময় কেউ মাহমুদুর রহমানের কথায় কর্ণপাত করেনি।এমনকি বিএনপি-জামায়াতও না। যেহেতু কারচুপির মাধ্যমে তাদের পছন্দের দল ক্ষমতায় আরোহণ করেছে তাই কথিত সুশীল সম্প্রদায় এ নির্বাচন নিয়ে বিশেষভাবে আহলাদিত ছিল। মিডিয়ায় নানা মাত্রিক গলাবাজির মাধ্যমে এসব সুশীল(?) এই নির্বাচনকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা নির্বাচন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। শেখ হাসিনার পতন না হলে আজ্ও ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের পার্লামেন্ট নির্বাচন একটি সহীহ নির্বাচন হিসেবে তালিকার শীর্ষে থাকতো!
২০০৮ সালের নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৮৭.২ শতাংশ। ৮৮টি আসনে ৯০শতাংশের বেশি ভোট পড়েছিল। ১১টি জেলার কোন আসনেই ৯০ শতাংশের কম ভোট পড়েনি। রাজশাহী এবং খুলনা বিভাগে ৯০শতাংশের বেশি ভোট পড়েছিল। আর রাজশাহী-৫ আসনে ভোট পড়েছিল ৯৫.৯ শতাংশ ! ঐ সময় নিউ এজ পত্রিকায় সাংবাদিক তায়িব আহমেদ নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে দেখিয়েছিলেন যে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রতিটি ভোট কাস্ট হতে গড়ে মাত্র ৭২ সেকেন্ড সময় লেগেছিল। এই সময় অবিশ্বাস্য। নির্বাচনে ভোট গ্রহণের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি মাত্র ৭২ সেকেন্ড একটি ভোট কাস্ট করা কোনভাবেই সম্ভব নয়।
মাহমুদুর রহমান নয়াদিগন্তে প্রকাশিত ০৭.০১.২০০৯ইং তারিখের কলামে ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে ১১৯টি আসনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে উপসংহার টানেন এভাবে: “ অন্তত ১০ শতাংশ ভুতুড়ে ভোট এবারের প্রকৃত প্রদত্ত ভোটের সাথে সংযুক্ত করেই চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো, ২০০৮ সালের নির্বাচনের দুইদিন আগে আ্ওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান এইচ টি ইমাম মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে বিজি প্রেসের কর্মকর্তদের সহায়তায় জাল ব্যালট ছাপানোর এক উদ্ভট অভিযোগ করেছিলেন। অথচ এইচ টি ইমাম তার এই অভিযোগের পক্ষে কোন প্রমাণ হাজির করতে পারেননি। আসলে এটা ছিল এইচ টি ইমামরা নিজেরা যা করতে যাচ্ছেলিনে তার দায় আগে থেকেই আরেকজনের উপর চাপিয়ে রেখে নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা। এ কাজ বিগত ১৭ বছরের শাসনে আ্ওয়ামী লীগ বহুবার নানা মডেলে করেছে। মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে এইচ টি ইমামের এই অভিযোগ দ্বারা প্রমাণ হয় তারা নিজেরাই এরকম কোন বন্দোবস্ত রেখেছিল।
২০০৮ সালের নির্বাচনের কারচুপির ধরণ নিয়ে আমার একটি নিজস্ব অনুমান আছে। নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ বলা হয়েছিল যে, ১ কোটি ব্যালট ভুল ছাপা হয়েছে এবং এ ব্যালট পেপারগুলো নষ্ট করে ফেলা হবে। আমার ধারণা এই ১ কোটি ব্যালট নষ্ট না হয়ে জাদুর ব্যালটে পরিনত হয়েছিল্। এরপর জাদুকরী কোন মেটিকুলাস ডিজাইনের অধীনে ঐ জাদুর ব্যালট নৌকা প্রতীকে ছাপযুক্ত হয়ে ব্যালট বাক্সে ঢুকে পড়েছিল অথবা নৌকার ভোটের সাথে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। এই জাদুর ব্যালটই এক-এগারোকে সাফল্যমন্ডিত করেছিল। তাই হাসিনা তৈরীর সব দায় এই জাদুর ব্যালটের। হতে পারে ইচ্ছাকৃতভাবে বিশেষ উদ্দেশ্যে ১ কোটি ব্যালট বেশি ছাপানো হয়েছিল। এবং পরিকল্পনা মাফিক নির্দিষ্ট ডিস্ট্রিবিউশন চানেলে ব্যবহার করে এই ব্যালট যথাস্থানে পৌঁছে দেয়ার সময় যদি কারো চোখে পড়ে যায় তাই সতর্কতা হিসেবে ব্যালট ভুল ছাপা হ্ওয়া ও নষ্ট করে ফেলার এই গল্প আগে থেকেই বলে রাখা হয়েছিল। যেন কেউ সন্দেহ না করে। এটা নিছকই আমার ধারণা। ২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়ে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হলেই কারচুপির আসল তরিকা প্রকাশ পাবে। ২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়ে আমার এ ব্যক্তিগত অভিমত আমার কাছে আরো বেশি দৃঢ় হ্ওয়ার আরেকটি কারণ হলো নির্বাচনের পরে বিভিন্ন জায়গায় অব্যবহৃত ব্যালট, ব্যালট বইয়ের মুড়ি পরিত্যক্ত অবস্থায় পা্ওয়া যা্ওয়ার, এমনটি ব্যালটের মুড়ি দিয়ে রান্না করার খবর পত্রিকায় পড়েছিলাম। কয়েকদিন ধরে এমন খবর প্রকাশিত হ্ওয়ার প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কোন তদন্ত না করে বা ব্যাখ্যা না দিয়েই উল্টো হুমকি দিয়েছিল যে, ব্যালট, ব্যালট বইয়ের মুড়ি পা্ওয়ার কথা যারা বলবে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।
সংসদ নির্বাচন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৪,২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের মাস্টারপ্লান করা হয়েছিল ২০০৮ সালের পরে। প্রকৃতপক্ষে ২০০৮ সালের নির্বাচনাটাই ছিল একটি অভিন্ন মাস্টার প্লানের অংশ। কিন্তু ২০০৮ সাল এবং এর পরের নির্বাচনগুলোতে একই কৌশল দুইবার প্রয়োগ করা হয়নি। কিন্তু পূর্ববর্তী কৌশল থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে পরবর্তী কৌশল সাজানো হয়েছে। যেমন- ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন করার পর ২০১৮ সালের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেখানোর মিশন হাতে নেয়া হয়। আর এ মিশনের পাইলট প্রজেক্ট ছিল ২০১৫ সালের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। এ নির্বাচনে আমি প্রথমবারের মত নির্বাচনী কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকার একটি কেন্দ্রে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করি। এ নির্বাচনে রাতেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করার একটা প্রচেষ্টা ছিল, কিন্তু অতটা মরিয়া প্রচেষ্টা ছিল না। অধিকাংশ ভোট কেন্দ্রে প্রথম ২-৩ ঘন্টা সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণ চলছিল। ভোটের হা্ওয়া বুঝতে পেরে বেলা ১২ টার পরেই অধিকাংশ ভোট কেন্দ্র আ্ওয়ামী লীগ দখল করে নেয়। আমার বুথে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা ঢুকে ব্যালট পেপারগুলো কেড়ে নিয়ে আমাকে ব্যালটের পিছনে অনুস্বাক্ষর ও নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত বিশেষ সিল দিতে চাপ দেয়। আমি অস্বীকার করে তড়িঘড়ি করে প্রিসাইডিং অফিসারের কক্ষে এসে তাকে সব অবহিত করি। প্রিসাইডিং অফিসার এসে জাল ভোট দিতে থাকা ছাত্রলীগ ক্যাডারদের মৃদু ভর্ৎসনা করে চলে আসেন। তারা তাদের কাজ করতে থাকে। আসলে প্রিসাইডিং অফিসারেরও তেমন কিছু করার ছিল না। কারণ প্রিসাইডিং অফিসারের কক্ষে বসে আসেন কোমরে পিস্তল ঝোলানো সিভিল পোশাক পরা বিশেষ বাহিনীর এক কর্তা। আলাপচারিতায় তিনি জানালেন প্রধানমন্ত্রীর (হাসিনার) নির্দেশ অমুককে মেয়র বানাতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে তিনি এসেছেন। তিনি ভাবলেশহীনভাবে একথা বলছিলেন, যেন কি এক মহান আদেশ পালন করতে তিনি এসেছেন। আর আমরা্ও সেহেতু সরকারের গোলাম তাই প্রধানমন্ত্রীর আদেশ পালন না করলে যেন গুনাহ হবে। রাষ্ট্রীয় পাহারায় বিশেষ প্রতীকে ছাত্রলীগ-যুবলীগ-আ্ওমী লীগের ক্যাডারেরা সিল মারতে থাকে। আমরা গণনা করলে যদি ভোট বাতিল করি তাই প্রিসাইডিং অফিসারের কক্ষে বসে ঐ কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছাত্রলীগ কর্মীরা সব ভোট গণনা করে। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা আমরা প্রায় সবাই অসহায়ভাবে এ দৃশ্য দেখছিলাম। আমাদের কেন্দ্রের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তিতুমীর কলেজের এক ছাত্রলীগ নেতাকে। তিনি আমাকে আলাপচারিতায় জানিয়েছিলেন এই অ্যাসাইমেন্ট ঠিকঠাক বাস্তবায়ন করতে পারলে দলে তার প্রমোশন হবে। এ কাজে সহায়তাকারী অন্যদের জন্যই নিশ্চয়ই এমন প্রণোদনা ছিল।
সিটি নির্বাচনের পরদিন দলীয় কর্মীদের দিয়ে রাতেই ব্যালট বাক্স ভরতে চেষ্টা করা এবং না পেরে দলীয় লোক দিয়ে কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দেয়ার বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমে ব্যাপক কাভারেজ পায়। সরকার বিব্রত হয়। এ নির্বাচন পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ব্যাপকহারে নিয়োজিত করা হয়েছিল। নির্বাচনের পরদিন ব্যাংক পাড়ায় এ নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা এবং হাস্যরসাত্মক আলোচনা চলতে থাকে। সবাই একে অপরের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে থাকেন। এ অবস্থা থেকে সরকারকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্তাব্যক্তিরা। নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের ডেকে নির্বাচনের অভিজ্ঞতা বিনিময় না করার জন্য মৌখিকভাবে নির্দেশ দেয়া হয় এবং নির্বাচন নিয়ে কারো সাথে আলোচনা করার অভিযোগ পা্ওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দেয়া হয় (সূত্র: দৈনিক নয়াদিগন্ত, ১১ মে ২০১৫)। রাষ্ট্রীয় অধ:পতন কোথায় গিয়ে ঠেকেছিল ভাবা যায়!
২০১৫ সালের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হয় ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে। ২০১৫ সালের অভিজ্ঞতার আলোকে দলীয় বাহিনী দিয়ে কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট প্রদান কিংবা দলীয় বাহিনী দিয়ে দিয়ে রাতেই কাজ সেরে ফেলার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে ইলেকশন কমিশন, প্রশাসন এবং পুলিশের সহায়তায় রাতেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখার একটি সুশীল(?) প্ল্যান করা হয়। ইলেকশন কমিশনের সহায়তায় নিঁখুত পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল পুলিশের মাধ্যমে প্রতিটি কেন্দ্রের ২০-২৫% ব্যালটে রাতেই নৌকায় সিল মেরে ব্যালট বাক্সে ঢুকিয়ে রাখা। ২০১৫ সালের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে যে সকল কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছিলেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদেরকেই দায়িত্বে রাখা হয় ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে। আগে থেকেই নির্বাচনী কর্মকর্তাদের গোয়েন্দা প্রতিবেদন নেয়া হয়। ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে আমি প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করি। প্রশিক্ষণের দিন গিয়ে দেখতে পাই প্রায় সবাই পরিচিত। প্রশিক্ষণের শেষ দিন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং প্রিসাইডিং অফিসারেরা একযোগে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তার কাছে জানতে চান যে, রাতে যদি কেউ ২০১৫ সালের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মত জোরপূর্বক ব্যালটে সিল দিতে আসে তাহলে আমাদের করণীয় কি হবে? নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা নানাভাবে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাচ্ছিলেন। শেষমেষ তিনি বললেন, আমরাতো আপনাদের ঢাল-তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করতে পাঠাচ্ছি না। মেসেজ ক্লিয়ার। নির্বাচন কমিশন কি চাচ্ছে তা পরিষ্কার হয়ে যায় সবার কাছে।
প্রতিটি কেন্দ্রে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তার উপর রাতেই অন্তত কেন্দ্রের ২০% ব্যালটে রাতেই নৌকায় সিল মেরে ব্যালট বাক্সে ঢুকিয়ে রাখার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। সম্ভবত এ কাজের সাথে তাদের রুটি-রুচির প্রশ্ন জড়িয়ে গিয়েছিল। যে ব্যর্থ হবে তার শাস্তি অবধারিত। কেউ কেউ হয়তো উৎসাহের সাথে করেছে, তবে সবাই না। আমার কেন্দ্রে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রচন্ড চাপে থাকতে দেখেছি। বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত মনিটর করা হচ্ছিল। বিভিন্ন এজেন্সির লোকদের আনাগোনা ছিল অস্বাভাবিক। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সশরীরে আসছিলেন পরিস্থিতি মনিটর করতে। আমার কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশের এসআই তার ঊর্ধ্বতনের কাছে ঐ কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা ডিজিএফআই সদস্যের ব্যাপার অভিযোগ জানালে পুলিশের ঐ বড় কর্তা একনাগাড়ে কয়েকটি সংস্থার নাম উল্লেখ করে বললেন: এরা কেন্দ্রের কাছে আসলে লাথি মেরে বের করে দিবে। রক্ষকই ছিল ভক্ষকের ভূমিকায়। অথচ নির্বাচনের পর সবাই একযোগে গালমন্দ করছিল প্রিসাইডিং অফিসারদের । নিরুপায়, ভীত-সন্ত্রস্ত প্রিসাইডিং অফিসারদের কিছুই করার ছিল না। প্রতিরোধ করতে গেলে লাঞ্ছিত হ্ওয়া ছাড়া ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের আর কোন নিয়তি ছিল না। এবং প্রতিরোধ করতে গিয়ে কেউ কেউ শারিরীকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন এমন নজিরও আছে। ২০১৮ সালের রাতের ভোটের সম্পূর্ণ দায় নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন এবং পুলিশের। সংসদ নির্বাচন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, প্রতিটি নির্বাচনে ভোটগ্রহণের হার পরিবর্তন করা হয়েছে। এটা ইসিকে দিয়ে করানো হয়েছে, ডিসিকে ব্যবহার করা হয়েছে (সূত্র: আমার দেশ, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬)।
বর্তমানে “ম্যানেজড’ নির্বাচনের যে গুঞ্জন বা শংকা তা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে সেটা বাস্তবায়নে পূর্বে যারা ভাড়ায় খেটেছে এবারও তারাই এ কাজ আঞ্জাম দেবে। পরিকল্পনা হয়তো অভিন্ন হবে, কিন্তু ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত হাসিনার অধীনে করা নির্বাচনী ম্যাকানিজম থেকে অভিজ্ঞতা নেয়া হবে বলে আমার বিশ্বাস।
বর্থমান অন্তরবর্তী সরকার বর্থমান প্রশাসন দিয়ে একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে পারবে এমন আস্থার জায়গায় পুলিশ এবং প্রশাসন নাই। নির্বাচন কমিশনকে ঘিরেও আস্থার সংকট তৈরী হচ্ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার যেদিন বললেন ওসমান হাদির হত্যাকান্ড একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, সেদিনই অনেক কিছু পরিস্কার হয়ে গেছে। প্রধান উপদেষ্টা বলছেন তিনি ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নির্বাচন উপহার দেবেন। আমরা আশা করবো এটা যেন শামছুল হুদা কমিশনের মত নিছক বাগাড়ম্বর না হয়।
২০০৮ সালে নির্বাচন হয়েছিল এক-এগারোর জরুরী সরকারের অধীনে। ব্যারিস্টার রফিকুল হক এক-এগারোর সরকারকে পিতৃপরিচয়হীন বলে অভিহিত করেছিলেন (সূত্র: কালের কন্ঠ, ১১ জানুয়ারী ২০১০)। এক-এগারোর ঐ পিতৃপরিচয়হীন সরকারের মাধ্যমেই শেখ হাসিনার খুনি শাসনের অংকুরোদগম হয়েছিল। ড. ইউনুসের সরকার পিতৃপরিচয়হীন নয়। কিন্তু তার সরকারের হাতে যদি একটি “ম্যানেজড’ নির্বাচনের মাধ্যমে আরেকটি নতুন ফ্যাসিস্ট শাসনের অংকুরোদগম ঘটে তাহলে ড. ইউনুসের নামও পিতৃপরিচয়হীনদের সাথে উচ্চারিত হবে।
শহীদ শরীফ ওসমান হাদি বলেছিলেন, “জান দেবো, কিন্তু জুলাই দেবো না”। ওরা হাদির জান নিয়ে নিয়েছে। আর এবার যদি একটি “ম্যানেজড’ নির্বাচন করে পার পেয়ে যায় তাহলে “জুলাই’- কে হত্যার কাজ্ও তারা সম্পন্ন হবে। জনতার সতর্ক নজরদারী আর প্রবল প্রতিরোধ ছাড়া জুলাইকে রক্ষা করা যাবে না।



