দাবি: আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে যে, ঢাকার বিভিন্ন সংসদীয় আসনে লাখে লাখে ভুয়া ভোটার যুক্ত করা হয়েছে। কিছু কিছু পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, প্রতি আসনে গড়ে ৫০ হাজার করে ভোটার বাইরে থেকে আমদানি করা হয়েছে।
ফ্যাক্ট-চেক: মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর। নির্বাচন কমিশনের দাপ্তরিক পরিসংখ্যান এবং প্রশাসনিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই দাবির কোনো ভিত্তি নেই। ভোটার সংখ্যার যে পরিবর্তন হয়েছে, তা মূলত প্রশাসনিক সীমানা পুনর্নির্ধারণ এবং স্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফল।
দাবির ব্যবচ্ছেদ ও প্রকৃত তথ্য বিশ্লেষণ

১. দাবি: প্রতি আসনে ৫০ হাজার ভোটার আমদানির গুজব
প্রকৃত তথ্য: নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক তালিকা (ছবিতে প্রদর্শিত) অনুযায়ী, ঢাকার ২০টি আসনে মোট ভোটার স্থানান্তর হয়েছে মাত্র ৪৯,৯৯২ জন। অর্থাৎ, গড়ে প্রতিটি আসনে স্থানান্তরিত ভোটারের সংখ্যা প্রায় ২,৫০০ জন।
- সর্বোচ্চ স্থানান্তর: ঢাকা-১ আসনে ৪,৭৩২ জন।
- সর্বনিম্ন স্থানান্তর: ঢাকা-৭ আসনে ৬৭৬ জন।
২ কোটি মানুষের মেগাসিটিতে বাসা বদল বা এলাকা পরিবর্তনের কারণে ১% এর কম মানুষের ঠিকানা পরিবর্তন হওয়া খুবই স্বাভাবিক একটি জনমিতিক প্রক্রিয়া। প্রতি আসনে ৫০ হাজার ভোটার যোগ হওয়ার দাবিটি পরিসংখ্যানগতভাবেই অসত্য।
২. দাবি: ঢাকা-২ ও ঢাকা-৭ আসনে অস্বাভাবিক ভোটার হ্রাস-বৃদ্ধি
প্রকৃত তথ্য: পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা-২ আসনে ভোটার কমেছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার (২০২৪-এ ৫,৫৮,৯৫৪ থেকে ২০২৬-এ ৪,১৯,২১৫)। অন্যদিকে, ঢাকা-৭ আসনে ভোটার বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার (২০২৪-এ ৩,৪৩,০৮৯ থেকে ২০২৬-এ ৪,৭৯,৩৭৬)।
এই বিশাল পরিবর্তনের মূল কারণ কোনো ‘ভুতুড়ে ভোটার’ নয়, বরং আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে কামরাঙ্গীরচর এলাকা (ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড), যা আগে ঢাকা-২ আসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল, তা এবার ঢাকা-৭ আসনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে এক আসনে যে পরিমাণ ভোটার কমেছে, অন্য আসনে প্রায় সমপরিমাণ ভোটার বেড়েছে। এটি একটি প্রশাসনিক ও গাণিতিক সমন্বয় মাত্র।
একইভাবে, ঢাকা-৪, ঢাকা-৫ ও ঢাকা-১৪ আসনের সীমানাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে, যার ফলে সেসব আসনে ভোটারের সংখ্যায় যৌক্তিক পরিবর্তন এসেছে।
৩. দাবি: ঢাকা-১৫ আসনে ৫০ হাজার বাড়তি ভোটার
প্রকৃত তথ্য: ঢাকা-১৫ আসনের ভোটার বৃদ্ধির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৮ সালে ভোটার ছিল ৩.৪০ লাখ, ২০২৪ সালে ৩.৪৪ লাখ এবং ২০২৬ সালে তা হয়েছে ৩.৫১ লাখ। গত দুই বছরে এখানে ভোটার বেড়েছে মাত্র ৭ হাজার। এর মধ্যে অন্য এলাকা থেকে স্থানান্তরিত হয়ে আসা ভোটারের সংখ্যা মাত্র ৩,৫২০ জন, যা মোট ভোটারের মাত্র ১ শতাংশ। ঢাকার মতো শহরে এই হার অত্যন্ত নগণ্য।
৪. দাবি: বায়োমেট্রিক যুগেও ব্যাপক হারে দ্বৈত ভোটার
প্রকৃত তথ্য: বাংলাদেশে বর্তমানে ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বায়োমেট্রিক (আঙ্গুলের ছাপ ও আইরিস স্ক্যান) এবং স্মার্ট এনআইডি ভিত্তিক। এই প্রযুক্তির কারণে একজন ব্যক্তির পক্ষে একাধিক এনআইডি নেওয়া বা একাধিক স্থানে ভোটার হওয়া সিস্টেমেটিক্যালি প্রায় অসম্ভব।
গত দুই বছরে ঢাকায় মোট ভোটার বেড়েছে ৩ লাখ ৪ হাজার ৪৬৬ জন, যা মোট ভোটারের ৪.১৬ শতাংশ। বাংলাদেশে বার্ষিক গড় ভোটার বৃদ্ধির হার প্রায় ২ শতাংশ। সেই হিসেবে ঢাকার এই প্রবৃদ্ধি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও জনমিতিক নিয়মের মধ্যেই পড়ে।
ঢাকার বিভিন্ন আসনে ‘লাখে লাখে’ ভুয়া ভোটার বা প্রতি আসনে ৫০ হাজার ভোটার আমদানির যে দাবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বিভ্রান্তিকর। নির্বাচন কমিশনের দাপ্তরিক উপাত্ত এবং সীমানা পরিবর্তনের গেজেট পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট যে, ভোটারের সংখ্যার পরিবর্তনগুলো প্রশাসনিক সীমানা পুনর্বিন্যাস এবং স্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির যৌক্তিক ফলাফল।



