দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি বলতে গেলে মানবসভ্যতার সবচেয়ে অস্থির সময়গুলোর একটি ধীরে ধীরে কীভাবে তৈরি হয়েছিল তা বোঝা যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট তৈরি হয়েছিল, তার অনেকগুলো কারণই পরবর্তী বড় যুদ্ধের মাটিকে আরও শক্ত করে দেয়। ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তি জার্মানিকে কঠোর শর্তে বাধ্য করে। ক্ষতিপূরণ, আত্মসমর্পণের চাপ ও সামরিক শক্তি সীমিত করার নিয়মগুলো জার্মান জনগণের মনে গভীর হতাশা আর ক্ষোভ জন্ম দেয়। সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে অ্যাডলফ হিটলার জাতীয়তাবাদ, প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় ওঠেন। অনেক সাধারণ মানুষ ভেবেছিল যে হিটলার দেশকে আবার শক্তিশালী করবে, তাই তার প্রতি সমর্থনও কম ছিল না।
এ সময় ইউরোপের আরও কিছু দেশের রাজনৈতিক অবস্থাও দুর্বল ছিল। ইতালিতে মুসোলিনি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে সামরিক আগ্রাসনকে উৎসাহিত করেন। জাপানও এশিয়ায় সাম্রাজ্য বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করে দ্রুত শক্ত হয়ে ওঠে। এসব দেশ মনে করত যে তাদের আরও সম্পদ ও ভূখণ্ড পাওয়ার অধিকার আছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক চুক্তি তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আগ্রাসী নীতি অনুসরণ করা ছাড়া উপায় নেই বলে তারা দাবি করত। অন্যদিকে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স যুদ্ধ এড়াতে চাইত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত তখনও পুরোপুরি শুকায়নি, তাই তারা অনেক সময় আগ্রাসী দেশগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে সাহস পেত না। অনেকেই মনে করতেন আপস এবং সমঝোতা হয়ত যুদ্ধ ঠেকাতে পারে, কিন্তু বাস্তবে সেই নরম নীতি আগ্রাসীদের আরও উৎসাহিত করে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও পরিস্থিতি ভয়াবহ ছিল। ১৯৩০ সালের মহামন্দার ফলে বিশ্বের বহু দেশ দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভুগছিল। দুর্বল অর্থনীতি মানুষের মধ্যে স্থায়ী ভয়ের অনুভূতি তৈরি করে এবং অনেকেই তখন শক্ত হাতে নেতৃত্ব চাইতে শুরু করেন। হিটলার, মুসোলিনি বা জাপানের সামরিক নেতারা নিজেদেরকে সেই শক্ত নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন যারা দেশকে দুর্দশা থেকে বের করে আনবে। তাই তাঁদের জনপ্রিয়তাও দ্রুত বাড়তে থাকে। কিছু মানুষ বিশ্বাস করত যে কঠোর নিয়ন্ত্রণই জাতীয় উন্নতির পথ। যদিও এই বিশ্বাস পরবর্তীতে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।
আবার কিছু ইতিবাচক দিকও উল্লেখ করা যায়, যদিও সেগুলো মূল যুদ্ধের ভেতর লুকিয়ে ছিল। সে সময় বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং শান্তি রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধারণা আরও স্পষ্ট হতে শুরু করে। অনেক দেশ বুঝতে পারে যে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সংস্থা ছাড়া বড় ধরনের সংঘাত রোধ করা কঠিন। সেই চিন্তা থেকেই পরে জাতিসংঘ গঠনের পথ তৈরি হয়। তাছাড়া যুদ্ধের আগের বছরগুলোতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও বেশ কিছু উন্নতি হয়েছিল যা বিশ্বকে নতুন দিক দেখায়। যদিও এই উন্নতির অনেকটাই সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়েছিল, তারপরও গবেষণার গতি মানুষকে ভবিষ্যতের জন্য নতুন ধারণা দেয়।
সব মিলিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি ছিল এক জটিল জালের মতো যেখানে ক্ষোভ, জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক দুর্বলতা এবং আগ্রাসী নেতৃত্ব একসঙ্গে মিশে যায়। কেউ দাবি করত প্রতিশোধ প্রয়োজন, কেউ বলত শক্তি দেখানোই পথ, আবার কেউ বিশ্বাস করত আপস করলে যুদ্ধ এড়ানো যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই বিভক্ত চিন্তাধারাই আরেকটি ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধকে ঠেকাতে পারেনি। ইতিহাসের এই পটভূমি আজও মনে করিয়ে দেয় যে বৈষম্য, ক্ষোভ, অর্থনৈতিক অস্থিতি এবং দুর্বল আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কত সহজেই পৃথিবীকে বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারে।



