১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর বাংলার সাহিত্যের ইতিহাসে এক কালো দিন হিসেবে স্মরণীয়। এই দিনে রাজদ্রোহের অভিযোগে গ্রেফতার হন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, এবং তার বই ‘যুগবাণী’ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। নজরুলের জন্মের পর থেকে বাংলা সাহিত্যে যে প্রতিভা দেখা যায়নি, তেমনই এক উজ্জ্বল প্রদীপ তিনি হয়ে উঠলেন যিনি জাতি, বর্ণ, গোত্র, বা সমাজের সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়েছিলেন।
নজরুল শুধু একজন কবি নন, তিনি ছিলেন বাঙালির প্রতিরোধের প্রতীক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে হঠাৎ ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে আনলেন চির বিদ্রোহের বাণী। তার কলম ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, এবং তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে কলমের শক্তি তলোয়ারের চেয়েও বেশি শক্তিশালী। তার লেখা ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের পরই, মাত্র ২৩ বছর বয়সে, তিনি রাতারাতি বাঙালির হৃদয়ে স্থান করে নেন।
তবে এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে আসে বিপদ। রাজশক্তি সচকিত হয় এবং নজরুলের বিরুদ্ধে নানা ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তার বই ‘যুগবাণী’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘ভাঙার গান’, ‘প্রলয়শিখা’, ‘চন্দ্রবিন্দু’ অনেকগুলোই নিষিদ্ধ করা হয়, এবং কবিকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো ‘প্রলয়শিখা’, যার জন্য তাকে ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিপুল তল্লাশি, পুলিশি নজরদারি, বই বাজেয়াপ্ত এই দমন-প্রচেষ্টা কবিকে থামাতে পারেনি।
নজরুলের কবিতায় পরাধীনতার লাঞ্ছনা, সমাজের অসাম্য, দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্পষ্ট। তার প্রতিটি কবিতা হয়ে উঠেছিল শোষিত, নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের হাতিয়ার। বিশেষত ভারতবর্ষের তখনকার সবচেয়ে জরুরি সমস্যা পরাধীনতার বিরুদ্ধে তার কবিতা যুবক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল।
কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যে বিদ্রোহ শুধু রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিকও ছিল। তিনি প্রচলিত ছন্দ ও নিয়মকে ভেঙে নতুন জোয়ার এনেছিলেন, যার ফলে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ধারা সৃষ্টি হয়। তার কণ্ঠকে স্তব্ধ করার জন্য বহুবার চেষ্টা করা হয়েছে, কারাগারে বন্দি করা হয়েছে, কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ বিধান কবির কণ্ঠ অবশেষে তার নিজস্ব সুর ও শক্তিতে মুক্ত হয়েছে।
দূর্দান্ত প্রতিভা, অবিচল সাহস ও অনন্য সাহিত্যের জন্য কাজী নজরুল ইসলাম আজও বাঙালির হৃদয়ে বিদ্রোহের প্রতীক। তার জীবন ও রচনা প্রমাণ করে যে, সত্য ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই কখনো বৃথা যায় না।



