আমেরিকা আবিষ্কার এক ঐতিহাসিক বিতর্ক

১৫ শতকের শেষ দিকে ইউরোপীয় বিশ্বদর্শন দ্রুত বদলাতে শুরু করেছিল। নাবিকরা তখন পৃথিবীর নতুন পথ খুঁজছিল, আর বাণিজ্য সম্প্রসারণ ছিল সবার প্রধান লক্ষ্য। ঠিক এই সময় ১৪৯২ সালে ইতালীয় নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস স্পেনের অর্থায়নে যাত্রা শুরু করেন, যার ফলেই ঘটে ইতিহাসের বিখ্যাত ঘটনা আমেরিকা আবিষ্কার। যদিও তিনি প্রথম মানব হিসেবে আমেরিকায় পৌঁছাননি, তাঁর অভিযানই ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে স্থায়ী যোগাযোগের দরজা খুলে দেয়।

কলম্বাসের উদ্দেশ্য ছিল সমুদ্রপথে পূর্ব ভারত বা এশিয়ায় পৌঁছানো। তিনি বিশ্বাস করতেন, পশ্চিমে যাত্রা করলেই দ্রুত এশিয়া পাওয়া যাবে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের সমুদ্রযাত্রার পর তিনি বাহামা অঞ্চলে পৌঁছান এবং ভুল করে ধারণা করেন যে তিনি এশিয়ার উপকূলে এসে গেছেন। এই ভুল ধারণার কারণেই তিনি স্থানীয় আদিবাসীদের “ইন্ডিয়ান” বলে ডাকেন, যা দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।

তবে আমেরিকার ভূমিতে মানুষ তখন নতুন ছিল না। বহু হাজার বছর ধরে সেখানে বসবাস করছিল আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যাদের অনেকে “রেড ইন্ডিয়ান” নামে পরিচিত। ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা আসার অনেক আগেই এরা নিজেদের সংস্কৃতি, রীতি, কৃষিকাজ, বাণিজ্য ও সামাজিক কাঠামো গড়ে তুলেছিল। কলম্বাস ও পরবর্তী অভিযাত্রীরা যখন আমেরিকায় আসে, তখন দখলীকৃত ভূখণ্ড বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বহু আদিবাসীকে বিতাড়িত করা হয়, জমি দখল করা হয় এবং অনেক স্থানে সহিংসতার মাধ্যমে জনপদ দখল চলে। ফলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি ও অস্তিত্ব সংকটে পড়ে।

এদিকে কলম্বাসকে নিয়ে ইতিহাসে নানান বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই বলেন, তিনি ছিলেন স্বল্পদূরদর্শী, দুই দিনের বৈরাগীর মতো একজন নাবিক, যার উদ্দেশ্য ছিল মূলত নতুন পথ আবিষ্কার নয়, বরং দ্রুত আয়ের চেষ্টা। তাঁর আবিষ্কারের গল্পের মধ্যেও আছে বহু ভুল তথ্য ও প্রচার। এই সব কারণে অনেক ইতিহাসবিদ কলম্বাসকে “আমেরিকা আবিষ্কারক” হিসেবে একতরফা কৃতিত্ব দিতে নারাজ।

আবার এও সত্য যে সমুদ্রযাত্রার ইতিহাস কলম্বাসের বহু আগে থেকেই অন্য সভ্যতার হাতে ছিল। আরব বণিকেরা বহু শতাব্দী ধরে ভারত মহাসাগর, আরব সাগর এবং পূর্ব এশিয়ার উপকূলজুড়ে সক্রিয়ভাবে সমুদ্রপথে বাণিজ্য করছিল। ভারত ও পূর্ব এশিয়ার বহু বাণিজ্যপথ প্রথম আবিষ্কার করেন আরব নাবিকেরা। এসব পথ নিয়ে তারা দীর্ঘদিন গোপনীয়তা বজায় রাখতেন, যাতে তাদের বাণিজ্যিক সুবিধা অক্ষুণ্ন থাকে। পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় শক্তি যখন মসলার ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে, তখন শুরু হয় “স্পাইস ওয়ার” বা মসলার জন্য প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় আরবরা ধীরে ধীরে নিজেদের প্রভাব হারাতে থাকে এবং বিশ্ববাণিজ্যে নেতৃত্ব চলে যায় ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলোর হাতে।

ফলে কলম্বাসের যাত্রা শুধু এক ভৌগোলিক আবিষ্কার নয়; এটি ছিল বিশ্বশক্তির পালাবদলের সূচনা। ইউরোপে তাঁর অভিযানের খবর পৌঁছানোর পর স্পেন, পর্তুগাল, ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ দ্রুত নতুন ভূমি দখলে নেমে পড়ে। স্বর্ণ, রূপা, নতুন ফসল, প্রাকৃতিক সম্পদ, সব মিলিয়ে আমেরিকা হয়ে ওঠে ইউরোপীয় সম্প্রসারণের কেন্দ্রবিন্দু। তবে এই লাভের পাশাপাশি রোগ, দখলদারিত্ব ও আদিবাসী নিপীড়ন বাড়ে, যা আমেরিকার সমাজে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

আজও ১৪৯২ সালের সেই ঘটনাকে ঘিরে বিতর্ক থেমে নেই। কেউ একে বিশ্বসভ্যতার নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখেন, আবার কেউ দেখেন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগের সূচনা হিসেবে। তবুও অস্বীকার করার উপায় নেই, এই ঘটনাই পৃথিবীর দুই মহাদেশকে প্রথমবারের মতো স্থায়ীভাবে যুক্ত করে মানব ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।