মহাকাশ বিজ্ঞানের কথা শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে বিশাল এক রকেট, যা আগুনের গোলক তৈরি করে নীল আকাশ চিরে উপরে উঠে যাচ্ছে। আমরা জানি নাসা বা স্পেস-এক্স তাদের রকেটে জ্বালানি হিসেবে তরল হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন ব্যবহার করে। কিন্তু আপনার মনে কি কখনো প্রশ্ন জেগেছে – যেখানে পারমাণবিক শক্তি (Nuclear Power) এত শক্তিশালী, সেখানে কেন এখনো পুরনো আমলের রাসায়নিক জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে?
চলুন, এই রহস্যের জট খোলা যাক এবং জেনে নেওয়া যাক কীভাবে পারমাণবিক শক্তি আমাদের মঙ্গল গ্রহ অভিযানের স্বপ্নকে সত্যি করতে পারে।
রাসায়নিক রকেট বনাম পারমাণবিক রকেট: মূল পার্থক্য কোথায়?

আমাদের বুঝতে হবে রকেট আসলে কাজ করে কীভাবে। রকেট কাজ করে নিউটনের তৃতীয় সূত্রের ওপর ভিত্তি করে – পেছন দিয়ে যত জোরে গ্যাস বের হবে, রকেট তত জোরে সামনে এগোবে।
- রাসায়নিক রকেট (Chemical Rocket): এখানে হাইড্রোজেন (জ্বালানি) এবং অক্সিজেন (অক্সিডাইজার) পুড়িয়ে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এই আগুনের ধাক্কায় রকেট ওপরে ওঠে।
- পারমাণবিক রকেট (Nuclear Thermal Rocket – NTR): এখানে কোনো আগুন জ্বলে না। রকেটের ভেতর একটি ছোট পারমাণবিক রিয়েক্টর থাকে। এই রিয়েক্টরের প্রচণ্ড উত্তাপে হাইড্রোজেন গ্যাসকে উত্তপ্ত করে পেছন দিয়ে বের করে দেওয়া হয়।
সহজ উদাহরণ: রাসায়নিক রকেট হলো একটি ‘স্প্রিন্ট রানার’ (১০০ মিটার দৌড়বিদ) – যে শুরুতে প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে দৌড় দেয় কিন্তু দ্রুত হাঁপিয়ে যায়। আর পারমাণবিক রকেট হলো ‘ম্যারাথন রানার’—যে দীর্ঘ সময় ধরে অনেক বেশি গতি বজায় রাখতে পারে।
কেন হাইড্রোজেন দিয়ে শুধু শুরুটা হয়, পুরো পথ নয়?

রকেট যখন পৃথিবী থেকে ওড়ে, তখন তাকে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১১.২ কিলোমিটার গতি অর্জন করতে হয় মাধ্যাকর্ষণ পার করার জন্য। এর জন্য দরকার বিপুল পরিমাণ তাৎক্ষণিক ধাক্কা বা Thrust। রাসায়নিক জ্বালানি এই বিপুল ধাক্কা দিতে ওস্তাদ।
কিন্তু সমস্যা হলো এর ‘মাইলেজ’ নিয়ে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে Specific Impulse ( Isp)।
- রাসায়নিক রকেটের Isp সর্বোচ্চ ৪৫০ সেকেন্ডের মতো।
- পারমাণবিক রকেটের Isp হতে পারে ৯০০ থেকে ১০০০ সেকেন্ড!
অর্থাৎ, একই পরিমাণ জ্বালানি দিয়ে পারমাণবিক রকেট দ্বিগুণ দূরত্ব বা দ্বিগুণ গতিতে যেতে পারবে। তাই মহাকাশ বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পৃথিবী থেকে উৎক্ষেপণের জন্য হাইড্রোজেন-অক্সিজেন ঠিক আছে, কিন্তু গভীর মহাকাশে ঘোরার জন্য পারমাণবিক শক্তিই সেরা সাশ্রয়ী উপায়।
পারমাণবিক রিয়েক্টর ঠান্ডা রাখার ‘ম্যাজিক’

একটি রিয়েক্টর যখন কাজ করে, তখন তার তাপমাত্রা প্রায় ৩০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে চলে যেতে পারে। পৃথিবীতে আমরা পানি দিয়ে রিয়েক্টর ঠান্ডা করি, কিন্তু মহাকাশে পানি আসবে কোথা থেকে? এখানে ইঞ্জিনিয়াররা দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করেন:
ক) রিজেনারেটিভ কুলিং (Regenerative Cooling)
রকেটে যে তরল হাইড্রোজেন থাকে, সেটি থাকে মাইনাস ২৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে। রিয়েক্টর ঠান্ডা করতে এই অতি-শীতল হাইড্রোজেনকে রিয়েক্টরের দেয়ালের ভেতরে থাকা সরু পাইপ দিয়ে প্রবাহিত করা হয়। এতে রিয়েক্টর ঠান্ডা হয়, আর হাইড্রোজেন গরম হয়ে নিজের শক্তি বাড়িয়ে নেয়। অর্থাৎ, জ্বালানি নিজেই এখানে কুল্যান্ট বা এসি হিসেবে কাজ করে।
খ) রেডিয়েশন প্যানেল
মহাকাশে তাপ বের করে দেওয়ার একমাত্র উপায় হলো ‘বিকিরণ’ বা Radiation। মহাকাশযানের বাইরে বড় বড় পাখা বা প্যানেল থাকে, যা রিয়েক্টরের বাড়তি তাপকে ইনফ্রারেড রশ্মি হিসেবে মহাশূন্যে ছুড়ে দেয়।
মহাকাশচারীদের নিরাপত্তা: রেডিয়েশন কি বিপদ বাড়াবে?

অনেকেই ভয় পান যে, রকেটে পারমাণবিক রিয়েক্টর থাকলে মহাকাশচারীরা তেজস্ক্রিয়তায় অসুস্থ হয়ে পড়বেন। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি উল্টো!
- শ্যাডো শিল্ডিং (Shadow Shielding): পুরো রিয়েক্টরকে ভারী সীসা বা কংক্রিট দিয়ে না ঢেকে, শুধু যেদিকে মহাকাশচারীরা থাকেন, সেদিকে একটি শক্তিশালী ঢাল বসানো হয়। এটি ওজন কমায় এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
- দূরত্বের সুবিধা: রকেটটি অনেক লম্বা হয় (প্রায় একটি ফুটবল মাঠের সমান)। রিয়েক্টর থাকে একদম শেষে, আর মানুষ থাকে একদম সামনে। মাঝখানের বিশাল দূরত্বই সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে।
- মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে রক্ষা: মহাকাশে সূর্যের ক্ষতিকর রেডিয়েশন (Cosmic Rays) সবসময় থাকে। পারমাণবিক রকেট ভ্রমনের সময় অর্ধেক কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ, মহাকাশচারীরা মহাকাশের প্রাকৃতিক বিকিরণে কম সময় কাটান, যা তাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।
কেন এটিই ভবিষ্যৎ? (নাসার DRACO প্রজেক্ট)
নাসা এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা সংস্থা DARPA যৌথভাবে DRACO নামক একটি প্রজেক্টে কাজ করছে। তাদের পরিকল্পনা হলো ২০২৭ সালের মধ্যে পৃথিবীর কক্ষপথে একটি পারমাণবিক রকেট ইঞ্জিন পরীক্ষা করা।
এটি সফল হলে:
- মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার সময় ৯ মাস থেকে কমে ৪ মাস হবে।
- মহাকাশযানে বেশি পরিমাণ খাবার এবং বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম নেওয়া সম্ভব হবে।
- মঙ্গলে পৌঁছানোর পর ওই একই রিয়েক্টর ব্যবহার করে সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে।
পারমাণবিক রকেট মানেই পারমাণবিক বোমা নয়; বরং এটি হলো শক্তির এক নিয়ন্ত্রিত ভাণ্ডার। পৃথিবী থেকে ওড়ার সময় আমরা হাইড্রোজেন বা রাসায়নিক শক্তির ওপর ভরসা রাখব ঠিকই, কিন্তু নক্ষত্রদের মাঝে ঘুরে বেড়ানোর জন্য পারমাণবিক শক্তিই হবে আমাদের প্রধান সারথি। বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রা একদিন হয়তো মঙ্গল গ্রহকে আমাদের দ্বিতীয় ঘর বানিয়ে তুলবে।



