‘হামযা (রা.)’ ছিলেন ‘রাসূল (সা.)’-এর চাচা। ‘রাসূল (সা.)’-এর নবুয়ত প্রাপ্তির ষষ্ঠ (৬ষ্ঠ) বছরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। বয়সের দিক থেকে ‘রাসূল (সা.)’-এর চেয়ে দুই বা চার বছরের বড় ছিলেন। ‘হামযা (রা.)’ ছিলেন মক্কার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি।
‘হামযা (রা.)’-এর ইসলাম গ্রহণের সংবাদ যখন চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন কাফির মুশরিকদের মনোবল অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়ে। এরই তিন দিন পর ‘ওমর (রা.)’ ইসলাম গ্রহণ করেন। এটি ছিল নবুয়তের ষষ্ঠ বছরের ঘটনা। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩/৩৩)
যেভাবে শহীদ হলেন
মক্কার তৎকালীন এক বিশিষ্ট ব্যক্তি ‘জুবাইর ইবনে মুতইম’-এর চাচা ‘তুআইমা ইবনে আদি’ বদর যুদ্ধে ‘হামযা (রা.)’-এর হাতে নিহত হন। ‘জুবাইর ইবনে মুতইম’-এর ছিল একজন হাবশি ক্রীতদাস, নাম ‘ওয়াহশি ইবনে হারব’। সে তার মাতৃভূমি আবিসিনিয়া থেকে আনা একটি বর্শা সবসময় সঙ্গে বহন করত। সে খুব নিখুঁতভাবে বর্শা নিক্ষেপ করতে পারত।
একদিন ‘জুবাইর’ ‘ওয়াহশি’কে বললেন, “তুমি যদি মুহাম্মদের চাচা ‘হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব’কে হত্যা করতে পারো, তাহলে তোমাকে মুক্তি দেওয়া হবে।” মুক্তির লোভে ‘ওয়াহশি’ উহুদ যুদ্ধে কুরাইশদের বাহিনীতে যোগ দেয়। ‘ওয়াহশি’র উদ্দেশ্য ছিল সর্বাত্মক যুদ্ধে অংশগ্রহণ নয়; সে এসেছিল শুধু ‘হামযা (রা.)’-কে হত্যা করতে। সে ঝোপের আড়াল থেকে ‘হামযা (রা.)’-এর পিছু নিতে থাকে। একপর্যায়ে সে ‘হামযা (রা.)’-কে তার হাতের নাগালে পেয়ে যায়। সে ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে এবং তার অব্যর্থ বর্শা ছুড়ে মারে। এক মিনিটের ব্যবধানে তা বিদ্ধ হয় ‘হামযা (রা.)’-এর বুকে। বর্শা বিদ্ধ হওয়ার পরও তিনি ‘ওয়াহশি’র দিকে এগিয়ে আসতে চান, কিন্তু তার আগেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এভাবেই শাহাদাত বরণ করেন ‘রাসূল (সা.)’-এর প্রিয় চাচা ‘আমির হামযা (রা.)’। ‘হামযা (রা.)’-কে হত্যা করে ‘ওয়াহশি’ আবার তাঁবুতে ফিরে যায়।
কাফেররা ‘হামযা (রা.)’-কে শহীদ করেই ক্ষান্ত হয়নি। বরং তাঁর লাশের সঙ্গেও নির্মমতার পরিচয় দেয়। ‘আবু সুফিয়ান’-এর স্ত্রী, পিশাচী নারী ‘হিন্দা’, তাঁর নাক-কান কেটে চেহারাকে বিকৃত করে ফেলে। তার বুক-পেট চিরে কলিজা বের করে এবং ক্ষোভে-ক্রোধে দাঁত দিয়ে তা চিবিয়ে ফেলে। প্রিয় চাচার নির্মম মৃত্যু ও লাশ দেখে ‘রাসূল (সা.)’ কান্নায় ভেঙে পড়েন। যুদ্ধ শেষে ‘হামযা (রা.)’-কে ‘মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.)’-এর সঙ্গে সমাহিত করা হয়।
শেষ কথা
আবু তালিবের মৃত্যুর পর তিনিই ছিলেন নবী পরিবারের উপর সবচেয়ে বড় ছায়া। যিনি ‘হামযা (রা.)’ যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর বুকে ত্রাস সৃষ্টি করতেন, তাঁকেই কাপুরুষের মতো পিছন থেকে বর্শা নিক্ষেপ করে হত্যা করে এক সামান্য হাবশি ক্রীতদাস। ‘হামযা (রা.)’-এর হত্যাকারী হাবশি ক্রীতদাস ‘ওয়াহশি’ এবং তাঁর লাশ বিকৃতকারী নারী ‘হিন্দা’—দুজনেই মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করেন। পরবর্তী জীবনে তারা দুজনেই ইসলামের বিস্তারে বড় ভূমিকা পালন করেন।